শিরোনাম :

ত্রাণ নয়, পরিত্রাণ চান দুর্গতরা


মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট ২০১৫, ১২:০০ পূর্বাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

ত্রাণ নয়, পরিত্রাণ চান দুর্গতরা

ইমাম খাইর, কক্সবাজার: কক্সবাজারে গত এক সপ্তাহ ধরে চলা বন্যার পানি কমলেও চরম দুর্ভোগে পড়েছেন জেলার পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ। এক মাসের ব্যবধানে তিন দফা বন্যায় প্লাবিত হয়ে চরম দুঃখ-কষ্টে, অনাহারে-অর্ধাহারে খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাচ্ছেন এসব মানুষ। রোববার সারাদিন ও সোমবার কক্সবাজারে বৃষ্টিপাত হয়নি। ফলে প্লাবিত এলাকার অধিকাংশ পানি নেমে গেছে। তবে কিছু কিছু স্থানে এখনো পানি রয়ে গেছে। দুর্গত এলাকার বাসিন্দারা এখনো বাড়ি ফিরতে পারেননি। Pic-1 Chakaria 03.08.15তবে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভেসে উঠছে বিধ্বস্ত হাজার হাজার ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও মৎস্য খামারসহ যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষতচিহ্ন। শত শত কিলোমিটার কাঁচা-পাকা সড়ক বিধ্বস্ত হয়ে চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ায় আরো দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে এসব বানভাসি মানুষদের। জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, এবারের বন্যায় প্লাবিত হয়েছে ৩৫টি ইউনিয়ন। এতে কক্সবাজারের পাঁচ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে দুর্ভোগে পড়েছে। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ‘কোমেন’ এর প্রভাবে ৩০ ও ৩১ জুলাই ফের টানা ভারী বর্ষণে পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে পূর্ণিমার প্রভাবে জোয়ারের পানি বেড়ে যাওয়ায় জেলার অধিকাংশ নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হয়। তবে ১ আগস্ট থেকে বৃষ্টিপাত কমতে শুরু করায় বন্যার পানিও কমতে শুরু করে। রোববার-সোমবার বৃষ্টিপাত না হওয়ায় অধিকাংশ প্লাবিত এলাকার পানি নামতে শুরু করে। এর আগেও গত ২৫ জুন থেকে ২৯ জুন পর্যন্ত টানা ভারী বর্ষণের সঙ্গে পাহাড়ি ঢলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল জেলার রামু, চকরিয়া, পেকুয়া ও কক্সবাজার সদরসহ বিভিন্ন এলাকায়। এতে জেলার আট লক্ষাধিক মানুষ বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছিল। এ সময় মারা যায় ১৯ জন। রামু উপজেলার বন্যাদুর্গত এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পাহাড়ি ঢলের স্রোতে ভেসে গেছে মানুষের বসতবাড়ি। অনেকের ঘরে পরনের কাপড়টি ছাড়া কিছুই নেই। পানিতে ভেসে গেছে হাঁস-মুরগি। নষ্ট গেছে বীজ তলা। এখনো ডুবে আছে ফসলী জমি।Coxs 03 August  (2) রামু উপজেলা সদরে রামু খিজারী উচ্চ বিদ্যালয়ে আট দিন ধরে আশ্রয় নেয়া আবুল কাশেম (৪৫) বলেন, ‘টানা তিন দফা বন্যার পানিতে ভেসে গেছে আমাদের অর্জিত সব সম্পদ। বিনিময়ে পেয়েছি কয়েক কেজি চাল। আমরা এক কেজি দুই কেজি চাল চাইনা। বন্যা থেকে পরিত্রাণ চাই। মানুষের মতো বাচঁতে চাই।’ হাইটুপী এলাকার ছৈয়দ আহমদ বলেন, ‘রামুর বাঁকখালী হাইটুপী এলাকায় বন্যার পানি ও জোয়ারের ধাক্কায় মাত্র তিনশ’ মিটার বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে গেছে। ওই ভাঙ্গা বেড়িবাঁধ দিয়ে বন্যার পানি, পাহাড়ি ঢল ও জোয়ারের পানি লোকালয়ে প্রবেশ করে বার বার ডুবে যাচ্ছে কয়েকশ’ গ্রাম। তলিয়ে যাচ্ছে বসতবাড়ি ও গাছপালা। গত একমাস আগেও বেড়িবাঁধে ভাঙ্গা ছিল মাত্র একশ’ মিটার। অল্প এই বেড়িবাঁধ নির্মাণ না করায় জোয়ারের পানিতে ভাঙ্গার পরিমাণ আরও বেড়ে যাচ্ছে। এক মাসে তিন দফা বন্যা হয়েছে।’ শুধু আবুল কাশেম ও ছৈয়দ আহমদ নয়, কক্সবাজারের রামু, চকরিয়া, পেকুয়া, টেকনাফ, মহেশখালী ও কক্সবাজার সদরের লাখ লাখ মানুষ ত্রাণ বদলে আর্তি জানাচ্ছেন এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের জন্য। দুর্গত এলাকার এসব মানুষের অভিযোগ, সরকার এখানকার মানুষের জন্য কিছুই করছে না। মানুষ তো ত্রাণ চায়না। ভালভাবে বাঁচতে চায়। সরকার বন্যা মোকাবেলায় বেড়িবাঁধ, নদী সংরক্ষণ তীর নির্মাণ, নদী ড্রেজিং, দখলমুক্ত করা, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন পরিকল্পিত পদক্ষেপ নিলে এমন ভয়াবহ দুর্যোগ থেকে মানুষ রক্ষা পেত। কিন্তু এসব কিছুই করছে না সরকার। রামু উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান রিয়াজুল আলম বলেন, ‘উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন এক মাসের ব্যবধানে দুবার বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। গতবারের বন্যায় ৬ হাজারের বেশি বসতবাড়ি সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এবার ২০ হাজারের বেশি বসতবাড়ি বিলীন হয়ে গেছে। তলিয়ে গেছে কৃষি ও মৎস্য খামারসহ হাজার হাজার একর ফসলি জমির খেত ও ফসল।’ Cox Pic-তিনি বলেন, ‘বন্যার পানি ও জোয়ারের ধাক্কায় ভাঙ্গা বেড়িবাঁধ দিয়ে পানি ঢুকে বার বার ক্ষতি হচ্ছে সাধারণ মানুষ। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বেশ কয়েকটি অভ্যন্তরীণ সড়ক ও বেড়িবাঁধ। জরুরী ভিত্তিতে ভাঙ্গন প্রতিরোধের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে ২০ লাখ টাকা বরাদ্দের একটি বিষয় প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। জরুরী ভিত্তিতে বেড়িবাঁধ নির্মাণে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।’ বন্যায় সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের শিকার হয়েছে উপকূলীয় পেকুয়া উপজেলার লোকজন। ইতিপূর্বে সংঘটিত বন্যায় পেকুয়া সদর, মগনামা, উজানটিয়া, শিলখালী ও বারবাকিয়া ইউনিয়নের বেড়িবাঁধ ভেঙে বিলীন হওয়ায় পুরো উপজেলা এবারের বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। একেবারে বিলীন হয়ে গেছে অসংখ্য মাটির তৈরি গুদামঘর ও কাঁচা বাড়ি। উপকূলীয় ইউনিয়ন মগনামা, উজানটিয়ার বেশ কয়েকটি এলাকা এখনো ডুবে আছে। পেকুয়া উপজেলা চেয়ারম্যান শেফায়েত আজিজ রাজু বলেন, ‘পেকুয়ার চারদিকে বেড়িবাঁধের ১০ টি পয়েন্টে ভয়াবহ ভাঙ্গনে লোকালয় এখন জোয়ার ভাটায় পরিণত হয়েছে। মাতামুহুরি নদীতে লামা ও আলীকদম থেকে নামা পাহাড়ি ঢলের ধাক্কায় বার্মার টেক, তেইল্যাকাটা, পুরুইত্যাখালী রাবার ড্যাম এলাকা, মগনামা ইউনিয়নের কাকপাড়া, শরতঘোনা, উত্তর পাড়া ও উজানটিয়া ইউনিয়নের টেকপাড়ার বেড়িবাঁধ সর্ম্পূণ ভেঙ্গে গেছে। উক্ত ভাঙ্গা অংশ দিয়ে বার বার জোয়ারের পানি ঢুকে প্লাবিত হচ্ছে বহু গ্রাম।’Pic-3 Chakaria 03..08.15 বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে চকরিয়ার কোনাখালী, বিএমচর, পুর্ববড় ভেওলা, ঢেমুশিয়া, বদরখালী ও পশ্চিম বড় ভেওলা ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষ। এসব ইউনিয়নের লাখো মানুষ এখনো আশ্রয় কেন্দ্রে রয়েছে। আশ্রিত এসব মানুষের মাঝে ত্রাণ বরাদ্দ দেওয়া হলেও তাদের দাবি পরিত্রাণ। কখন তারা বার বার এই দুর্ভোগ ও ক্ষতি থেকে পরিত্রাণ পাবে। মহেশখালীর মাতারবাড়ি মগডেইল, রাজঘাট, ফুলজানমুরা, ছোট মহেশখালীর তেলিপাড়া, মুদিরছড়া, কুতুবজোমের তাজিয়াকাটা, সোনাদিয়া, ঘটিভাঙ্গা, পৌর এলাকার হুনায়ার ছড়া, চরপাড়া গোরকঘাটা ইউনিয়নে পানিবন্দি মানুষের মাঝেও উঠেছে পরিত্রাণের দাবি। কক্সবাজার ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম জানিয়েছেন, ‘এবারের বন্যায় চকরিয়ার ৮টি, পেকুয়ার ৬টি, কুতুবদিয়ার ৩টি, কক্সবাজার সদরের ২টি, টেকনাফের ২টি, মহেশখালীর ৩টি, রামুর ১০টি ও উখিয়ার ১টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। বন্যার কারণে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ। ক্ষতিগ্রস্থ এসব লোকজনের জন্য ৫’শ মেট্রিক টন চাল ও নগদ ২০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।’ জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আলী হোসেন বলেন, ‘টানা বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও পূর্ণিমার জোয়ারের প্রভাবে রামু, পেকুয়া ও চকরিয়া উপজেলা বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এসব এলাকায় বেড়িবাঁধে ভাঙ্গন না থাকলে ক্ষতির পরিমাণ আরও কম হতো। এখন কিভাবে দ্রুত সময়ের মধ্যে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে পরিত্রাণ পাওয়া যায় সেই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’ জেলা প্রশাসক আরো বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড় কোমেন’র আঘাতে ক্ষতিগ্রস্থ টেকনাফ ও সেন্টমার্টিনে জরুরী চিকিৎসা সেবা ও ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।’ প্রসঙ্গত, এর আগে গত জুন মাসে প্রথম দফা বন্যার কবলে পড়ে কক্সবাজারের রামু, চকরিয়া ও পেকুয়ার বাসিন্দারা। এরপর জুলাইয়ের শেষ দিকে পরপর দুই দফা বন্যায় চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয় দুর্গত এলাকার লোকজন।Coxs 03 August  (3) বাংলাপ্রেস.কম.বিডি/এপি

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন