শিরোনাম :

সাগরের গ্রাসে কক্সবাজার সৈকতের ঝাউবাগান


মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০১৫, ১১:১৩ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

সাগরের গ্রাসে কক্সবাজার সৈকতের ঝাউবাগান

ইমাম খাইর, কক্সবাজার: সমুদ্র সৈকতে নামার আগেই সারি সারি সবুজের সমারোহ। দূর থেকে মনে হয় সেই ঝাউগাছগুলো যেন পর্যটকদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে। বিশ্বের দীর্ঘতম কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের সবুজ বেষ্টনী হিসেবে পরিচিত সেই ঝাউবাগান এখন সাগরের আগ্রাসনের কবলে পড়েছে। সৈকতের ভাঙ্গনের কবলে পড়ে বিলীন হয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার ঝাউগাছ। ১২০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এ সমুদ্র সৈকতে গত চার দশকে ভাঙ্গন এবং নিধনের শিকার হয়ে প্রায় ৬ লাখেরও বেশি গাছ।

ভাঙ্গন অব্যাহত থাকায় একদিকে সমুদ্র সৈকত সৌন্দর্য হারাচ্ছে, অন্যদিকে মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে। বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছে এখানের পর্যটক এবং পর্যটন শহরের মানুষ। পাশাপাশি হুমকীর মুখে পড়েছে সৈকতের জীববৈচিত্র।

কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সরদার শরিফুল ইসলাম বাংলাপ্রস.কম.বিডিকে জানান, অধিদপ্তর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্টের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় পানি ওভারফ্লু হচ্ছে। সৈকতে পর্যটকদের অবাধ বিচরণ এবং কিছু অসাধু লোকজন সৈকতের বালিয়াড়ি থেকে লতাপাতা কেটে নিয়ে যাওয়ায় কারণে সৈকতের বালিয়াড়ি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, সমুদ্র সৈকতে বালিয়াড়িগুলোকে অনেক আঁকড়ে ধরে রাখে সৈকত লতা, নিশিন্দাসহ গুল্ম জাতীয় লতা বা ঝোঁপগুলো। কিন্তু দিন দিন এসব লতা পাতা বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ায় সমুদ্রে সৈকতে ভাঙ্গন সৃষ্টি হয়েছে। তিনি আরো বলেন, ভাঙ্গনের কারণে একদিকে সৈকতের সৌন্দর্য যেমন নষ্ট হচ্ছে অন্যদিকে সাগর লোকালয়ের দিকে চলে যাওয়ায় কমে আসছে মূল ভুখণ্ড। এছাড়াও স্বাভাবিক সৈকত না থাকলে সামুদ্রিক কচ্ছপ, লাল কাঁকড়াসহ এধরনের প্রাণীগুলো আবাসস্থল হারাচ্ছে। ফলে বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে জীববৈচিত্র। সরেজমিনে দেখা গেছে, কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত প্রায় ১২০ কিলোমিটার সৈকতের পাশে সবুজ বেষ্টনীর মত দাঁড়িয়ে আছে ঝাউগাছ। সমুদ্র সৈকতের পাশাপাশি পর্যটকদের অসাধারণ সৌন্দর্য্যরে হাতছানি দিচ্ছে এ ঝাউবাগান। কিন্তু সাগরের করাল গ্রাসে শহরের নাজিরারটেক, চরপাড়া, সমিতি পাড়া, ডায়বেটিক হাসপাতাল, শৈবাল পয়েন্ট থেকে লাবনী পয়েন্ট পর্যন্ত ঝাউবাগানে নেমে এসেছে মহা বিপর্যয়। গত দুই বছরে শুধুমাত্র এসব এলাকায় বিলীন হয়েছে অন্তত পাঁচ হাজার গাছ। এ ছাড়াও পর্যটন স্পট হিমছড়ি, প্যাঁচারদ্বীপ, ইনানীসহ টেকনাফ পর্যন্ত বিভিন্নস্থানে ভাঙ্গন, নিধন এবং দখলের কবলে পড়েছে ঝাউবাগান।Coxs Pic-1 সমিতি পাড়ার বাসিন্দা মোস্তফা সরওয়ার বাংলাপ্রেস.কম.বিডিকে জানান, বিশেষ করে আশির দশকের পর থেকে সৈকতের বিভিন্ন অংশে ভাঙ্গনের সৃষ্টি হয়। বর্ষায় ভাঙ্গন আরো বেড়ে যায়। তিনি জানান, নাজিরারটেক থেকে লাবনী পয়েন্ট পর্যন্ত অব্যাহত ভাঙ্গনে গত দুই বছরে স্থানভেদে এক কিলোমিটারেরও বেশি বালিয়াড়ি বিলীন হয়ে গেছে। ইতিমধ্যে সাগরে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে প্যাঁচারদ্বীপ এলাকায় প্রায় ৩০ একর আয়তনের বাট্টু মিয়ার খামার। পাশের লোকালয় থেকে গত সোমবার ঝাউবাগানের ডায়বেটিক পয়েন্টে খড়ি সংগ্রহ করতে আসা রাবেয়া বেগম বলেন, সমুদ্র এক সময় এ হাসপাতাল থেকে অনেক দূরে ছিল। কিন্তু গত দুই বছরে ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে কাছে চলে আসে। অন্যদিকে, এসব ঝাউবাগান দখল করে সেখানে অবৈধ বসতি গড়ে তোলায় দিন দিন সৌন্দর্য্য হারাচ্ছে বিশ্বের দীর্ঘতম এ সমুদ্র সৈকত। শুধু দখল নয়, এসব অবৈধ দখলদারবাহিনী প্রতিদিন শত শত ঝাউগাছ কেটে নিচ্ছে। বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭৪ সাল থেকে ২০১১ পর্যন্ত কক্সবাজার সৈকতজুড়ে প্রায় সাতলক্ষ চারা রোপন করা হয়। কিন্তু ভাঙ্গন এবং অসাধু ব্যক্তিদের গাছ নিধনের কারণে বর্তমানে গাছের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২০ হাজারে। এতে উদ্বিগ্ন বন বিভাগও। তবে কক্সবাজার বন বিভাগের বিভাগীয় বনকর্মকর্তা মো. আলী কবির বাংলাপ্রেস.কম.বিডিকে জানান, যেসব এলাকাগুলোতে ভাঙ্গন সৃষ্টি হয়েছে অবস্থানগত কারণে সেখানে হয়তো আর চারা লাগানো যাবেনা। তবে বরাদ্দ আসলেই আরো নতুন নতুন জায়গায় বনায়ন করা হবে। কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো.আলী হোসেন বাংলাপ্রেস.কম.বিডিকে জানান, ঝাউবাগানের ভেতরে গড়ে তোলা এসব অবৈধ বসতি প্রায় সময় উচ্ছেদ করা হয়। কিন্তু উচ্ছেদের পরই আবার এরা ছোট ছোট ঘর তৈরী করে বসতি শুরু করে। এদের কারণে সাগরের সৌন্দর্য তো নষ্ট হচ্ছেই অন্যদিকে কাটা পড়ছে প্রচুর গাছ। তাই ঝাউবাগানে এসব অবৈধ বসতি উচ্ছেদে জেলা প্রশাসন জিরো টলারেন্স নিয়ে কাজ করছে। যেকোনোভাবে এসব স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে। জেলার বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ রামু ডিগ্রী করেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ প্রফেসর মোশতাক আহম্মদ বাংলাপ্রেস.কম.বিডিকে জানান, সপ্তম-অষ্টম শতাব্দীর দিকে আরো ২০ কিলোমিটার দূরে রামুর রামকোট এলাকায় ছিল সৈকতের অবস্থান ছিল। তখন সেখানে বড় বড় বিদেশি জাহাজ ভীড়তো। ইতিহাসে এর প্রমাণ মেলে। সেখান থেকে আস্তে সমুদ্র সৈকত বর্তমান অবস্থানে চলে আসে। তাঁর মতে সৈকতে ভাঙ্গন শুরু হয় পাকিস্তান আমল থেকে। সাগর ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে বর্তমান বিমান বন্দরের রানওয়ে পর্যন্ত চলে আসতো। আবার ভরতে ভরতে পেছনে চলে যায়। সাগরে ভাঙ্গনের সৃষ্টি হওয়ায় ১৯৭৪ সালের দিকে সৈকতের চরে ঝাউবাগান করার উদ্যেগ নেওয়া হয়। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্টের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় বিশেষ করে আশির দশকের পর থেকে সৈকতের বিভিন্ন অংশে ভাঙ্গন বেশি দেখা দেয়। তিনি বলেন, কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ১২৩ কিলোমিটার এখনো বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত। হিমছড়ির মেরিনড্রাইভ ধরে সামনে গেলেই এখানে চোখে পড়ে পাহাড়-সমুদ্রের অপূর্ব মেলবন্ধন। দূর থেকে দেখে মনে হয় সমুদ্রের ঢেউ আঁছড়ে পড়ছে পাহাড়ের গায়ে। যেন অসাধারণ সৌন্দযের হাতছানি। এতোসব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি এক সময় এ সৈকতে দেখা যেত সমুদ্রের বালিয়াড়িতে কচ্ছপের ডিম পাড়ার দৃশ্য, লাল কাকড়ার দৌড় ঝাঁপ কিন্তু এখন সে দৃশ্য অনেকটা বিলুপ্ত প্রায়। Coxs Pic-3 তবে সৈকত রক্ষায় বনায়নে নতুন ধারণার দিলেন কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সরদার শরিফুল ইসলাম। তিনি বাংলাপ্রেস.কম.বিডিকে বলেন, সমুদ্র সৈকতের অবস্থা আসলে হতে হবে চারটি স্থরে। যেমন-সমুদ্র, সমুদ্রের পরে থাকে বালুময় সৈকত, এরপরে থাকে বালিয়াড়ি। আর এসব বালিয়াড়িগুলোতে থাকতে হবে সৈকত লতা, আকন্দ, নিশিন্দাসহ বিভিন্ন লতাগুল্ম জাতীয় গাছ, লতাপাতার ঝোঁপঝাড়। যেগুলো বালিয়াড়ির মাটিকে মজবুত রাখবে। এরপরে হবে বনায়ন। তবে সমুদ্রের চরে শুধু ঝাউগাছ লাগিয়ে ভাঙ্গন ঠেকানো যাবেনা। তিনি বলেন, ঝাউগাছের শেকড় খুব কম। ঝাউগাছ খুব একটা মাটি ধরে রাখতে পারেনা। এছাড়া ঝাউবাগনের ভেতরে এক ধরনের বেসিনের মত গর্ত তৈরি হয়, যেখানে পানি জমে থাকে। জমে থাকা এসব পানি ভাঙ্গনকে তরান্বিত করে। তাই ভাঙ্গন রোধে ঝাউবনের পাশাপাশি নারকেলসহ অধিক শেকড়যুক্ত গাছ যেগুলো উপকুলীয় এলাকায় হয়,এ ধরনের গাছ লাগাতে হবে। এদিকে সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাস এবং ভাঙ্গন থেকে কক্সবাজারকে রক্ষার জন্য কক্সবাজার শহর রক্ষা বাঁধ নামের একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। কলাতলী বেইলী হ্যাচারী থেকে শুরু করে কলাতলী সৈকত, লাবনী পয়েন্ট, শৈবাল পয়েন্ট, ডায়বেটিক হাসপাতাল, পুরাতন বিমান বন্দর থেকে নুনিয়ারছড়া পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ এবং দুই কিলোমিটার অংশে বিভিন্ন প্রতিরক্ষামূলক কাজ, বেশ কয়েকটি পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এ প্রকল্পে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে একশো কোটি ৪৪ লাখ টাকা। তিনি বলেন, প্রকল্পটি ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারী একনেকের সভায় উত্তাপন করা হলে, প্রধানমন্ত্রী প্রকল্পটি নিয়ে কিছু অনুশাসন দেন। বর্তমানে এটি অনুমোদনের অপেক্ষায়। ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসকের সমন্বয়ে এ সংক্রান্ত চারটি সভাও হয়েছে। সবকিছু চূড়ান্ত হলেই আশা করছি এটি বাস্তবায়ন হবে। বাংলাপ্রেস.কম.বিডি/ইকে/এএইচ

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন