শিরোনাম :

লেবাননে নির্যাতনের শিকার ফাতেমার করুন কাহিনী


মঙ্গলবার, ২৯ আগস্ট ২০১৭, ০৫:২০ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

লেবাননে নির্যাতনের শিকার ফাতেমার করুন কাহিনী

শামীম আহমেদ, বরিশাল: লেবাননে যৌণ নির্যাতনে ব্যর্থ হয়ে অমানুষিক নির্যাতনের পর দোতালা থেকে ফেলে দিয়ে গুরুতর আহত করা হয়েছে বাংলাদেশের এক গৃহকর্মীকে। প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপে গুরুতর আহত গৃহকর্মী ফাতেমা বেগমকে (৩০) দেশে ফিরিয়ে আনার পর প্রথমে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ও পরে মুর্মুর্ষ অবস্থায় সাভার সিআরপি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সেখানে এখন প্রতিনিয়ত মৃত্যুর যন্ত্রণায় ছটফট করে কাতরাচ্ছেন বরিশালের উজিরপুর উপজেলার জল্লা বাহেরঘাট গ্রামের মৃত বেল্লাল সরদারের স্ত্রী ফাতেমা বেগম।

এ ঘটনায় ফাতেমার একমাত্র পুত্র সাগর সরদার বাদি হয়ে বরিশাল বিজ্ঞ মানব পাচার অপরাধ প্রতিরোধ দমন ট্রাইব্যুনালে প্রতারক তিন দালালের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। মামলার পর দালালদের পক্ষালম্বন করে স্থানীয় প্রভাবশালী একটি মহল মামলা উত্তোলনের জন্য বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতিসহ প্রাণনাশের হুমকি অব্যাহত রেখেছে। অপরদিকে প্রধান দালাল মেরিনা বেগম ফের কৌশলে পালিয়ে লেবানন যাওয়ার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মামলার বাদি ১৩ বছরের কিশোর অসহায় সাগর সরদার সঠিক তদন্তের মাধ্যমে দালালদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণসহ পুরো ক্ষতিপূরণ পেতে ও তার বিধবা মায়ের সু-চিকিৎসার জন্য প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

মৃত্যুর সাথে পাঞ্জালড়া বিধবা ফাতেমার উদ্বৃতি দিয়ে মঙ্গলবার সকালে তার নিকট আত্মীয় হেনা বেগম জনকন্ঠকে জানান, গত ১০ জানুয়ারি ফাতেমাকে লেবাননের বৈরুত বিমানবন্দর থেকে দালাল মেরিনা তার বাসায় নিয়ে যায়। পরবর্তীতে বৈরুতের মিস্তার ফদর নামের এক মালিকের কাছে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে ফাতেমাকে বিক্রি করে দেয় দালাল মেরিনা বেগম। সেখানে ওই মালিক (মিস্তার ফদর) ফাতেমাকে অনৈতিক কাজে রাজি করার জন্য প্রায়ই মারধর করতো। তার কথামতো কাজ না করলে ফাতেমাকে মেরে ফেলারও হুমকি দেয়া হয়।

এরইমধ্যে গত ১৩ মার্চ মিস্তার ফদর জোরপূর্বক ফাতেমার সাথে অনৈতিক কাজ করতে চাইলে ফাতেমা তাকে বাঁধা দেয়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে মিস্তার ফদর দোতালা থেকে ফাতেমাকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দেয়। এতে ফাতেমার মেরুদন্ডের হাঁড় ও ডান হাত ভেঙ্গে যাওয়াসহ শরীরের বিভিন্নস্থানে ক্ষতের সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে লেবাননে পুলিশের ঝামেলা এড়াতে দালাল মেরিনার যোগসাজসে মিস্তার ফদর বৈরুতের একটি বেসরকারী হাসপাতালে ফাতেমাকে ভর্তি করেন। সেখানে টানা ২৭দিন চিকিৎসাধীন ছিলেন বিধবা ফাতেমা বেগম।

ফাতেমার ভাই একই উপজেলার উত্তর বরাকোঠা গ্রামের আক্কেল আলী বেপারীর পুত্র সহিদ বেপারী জানান, লেবাননে যাওয়ার পর ফাতেমার সাথে তাদের মোবাইল ফোনের সকল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে লেবাননে অবস্থানরত দালাল মেরিনা বেগমের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করার পর সে জানায়, ফাতেমা তার মালিকের সাথে দুবাইতে ঘুরতে গিয়েছে। এর কিছুদিন পর ফাতেমা অতিগোপনে তাদের ফোন করে জানায়, তার ফোন মেরিনা নিয়ে গিয়েছে। সে (ফাতেমা) খুব কস্টে আছে। দালাল মেরিনা মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে তাকে যে মালিকের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে সেই মালিক তার কথামতো কাজ না করায় তাকে খুব মারধর করছে।

সহিদ ্েবপারী বলেন, এ ঘটনার পর দালাল মেরিনার স্বামী দেশে অবস্থানরত সোহরাব হাওলাদারের সাথে যোগাযোগ করে আমার বোন ফাতেমাকে দেশে ফেরত পাঠাতে বলি। পরে সোহরাব তার স্ত্রীর সাথে যোগাযোগ করে ফাতেমাকে দেশে ফেরত আনতে হলে বিমানভাড়া বাবদ ৫০ হাজার টাকা দাবি করে। তার দাবি অনুযায়ী ধারদেনা করে ৪০ হাজার টাকা পরিশোধ করা সত্বেও ফাতেমাকে দেশে পাঠাতে নানা তালবাহানা শুরু করা হয়। তিনি আরও বলেন, পরবর্তীতে লেবাননে অবস্থানরত একই গ্রামের সুজন হাওলাদারের মাধ্যমে খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারি ফাতেমা মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে মেরিনা ও মিস্তার ফদরের তত্ত্বাবধানে বৈরুতের একটি বেসরকারী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

এ খবর জানার পর উজিরপুর মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরী করা হয়। পরে থানা পুলিশ মেরিনার স্বামী সোহরাব হাওলাদারকে থানায় ডেকে এনে জরুরি ভিত্তিতে ফাতেমাকে দেশে ফেরত আনার জন্য চাঁপ প্রয়োগ করে। থানা পুলিশের চাঁপের মুখে ও লেবাননে অবস্থানরত সুজন হাওলাদারের চেষ্ঠায় গত ৯ এপ্রিল দালাল মেরিনা ফাতেমাকে মুর্মুর্ষ অবস্থায় দেশে নিয়ে আসে। বিমান বন্দরে ফাতেমাকে তার আত্মীয়-স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করে কৌশলে সটকে পরে দালাল মেরিনা। পরবর্তীতে ফাতেমাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পরামর্শে ফাতেমাকে ঢাকার সাভারের সিআরপি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে বর্তমানে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন নির্যাতিতা ফাতেমা বেগম।

কান্নাজড়িত কন্ঠে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়া বিধবা ফাতেমা বেগমের একমাত্র পুত্র সাগর বলেন, বাবার রেখে যাওয়া সহায় সম্পত্তি বিক্রি করে এবং ধারদেনা করে মা আমার ভবিষ্যতের জন্য বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলো। সেখান থেকে পূর্ণরায় মাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে দালাল সোহরাবকে ৪০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। এরপর গত পাঁচ মাস ধরে অসুস্থ্য মায়ের চিকিৎসা করাতে গিয়ে আজ আমরা নিঃস্ব হওয়াসহ দেনায় জর্জরিত হয়ে গেছি। আমার মায়ের কিছু হলে আমার দাঁড়ানোর কোন স্থান থাকবেনা। তাই সে (সাগর) দালালদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণসহ পুরো ক্ষতিপূরণ পেতে ও বিধবা মায়ের সু-চিকিৎসার জন্য প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

সাগরের দায়ের করা মামলার এজাহারে জানা গেছে, একই গ্রামের সোহরাব হাওলাদারের স্ত্রী মেরিনা বেগম দীর্ঘদিন থেকে লেবাননে বসবাস করে আসছেন। সে সুবাধে ফাতেমা বেগমের সরলতা ও অভাবের সুযোগ নিয়ে মেরিনার স্বামী সোহরাব ও নিকট আত্মীয় আলো বেগম অল্প খরচে লেবাননে বাসার কাজে মাসিক ৪০ হাজার টাকা বেতন পাবার জন্য ফাতেমাকে নানাপ্রলোভন দেখায়। এরইমধ্যে মেরিনা বেগম লেবানন থেকে ছুটিতে দেশে আসার পর সেও ফাতেমাকে বিভিন্ন ধরনের প্রলোভন দেখায়। তাদের প্ররোচনায় দেড় লাখ টাকার বিনিময়ে বাসার কাজে প্রতিমাসে ৪০ হাজার টাকা বেতন পাবার আশায় ফাতেমা রাজি হয়ে ধারদেনাসহ সহয় সম্ভল বিক্রি করে মেরিনা, তার স্বামী ও নিকট আত্মীয় আলো বেগমের হাতে পুরো টাকা তুলে দেন। পরবর্তীতে মেরিনা বেগম ছুটি শেষে লেবানন চলে যাবার পরে ভিসা পাঠিয়ে দেয়। গত ১০ জানুয়ারি মেরিনার স্বামী সোহরাব হোসেন বিধবা ফাতেমাকে ঢাকায় নিয়ে লেবাননে পাঠিয়ে দেয়।

সরেজমিনে স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, প্রতারক মানব পাচারকারী দালাল মেরিনা বেগম ও তার স্বামী সোহরাব হাওলাদারের বিরুদ্ধে একই উপজেলার উত্তর বরাকোঠা গ্রামের শহিদুল শরীফের স্ত্রী শেফালী বেগমসহ প্রায় দশজন নারী-পুরুষের কাছ থেকে লেবানন পাঠানোর কথা বলে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়ে নানা তালবাহানা করার অভিযোগ রয়েছে।

এ ব্যাপারে অভিযুক্ত দালাল মেরিনা বেগম ও তার স্বামী সোহরাব হাওলাদারের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তা বন্ধ থাকায় কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

 

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন