শিরোনাম :

দুঃখের মাঝে আলেয়ার ঘরে নতুন চাঁদ


মঙ্গলবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০৭:৪৮ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

দুঃখের মাঝে আলেয়ার ঘরে নতুন চাঁদ

ইমাম খাইর, কক্সবাজার: সোমবার সকাল ৯টা। শাপলাপুরের আকাশে আলো ঝলমল রোদ। নেই মেঘের ঘনঘটা। খোলা আকাশের নিচে প্রসব যন্ত্রণায় কাঁতরাচ্ছেন আলেয়া। আশপাশে বাড়িঘর নেই। অনুপায় হয়ে স্বজনরা এক টুকরো কাপড় টাঙিয়ে নিলো। সেখানেই আলেয়ার কোল আলো করে জন্ম নিলো ফুটফুটে এক ছেলে সন্তান। ছেলের মুখ দেখেই যন্ত্রণা ভুলে গেলো আলেয়া। ঠোঁটের কোণে এক টুকরো হাসি আসলো। কিন্তু এই হাসি ক্ষণিকের। কেননা, সোনালী রোদে জন্ম নেয়া এই শিশুটি মিয়ানমার জান্তার অবিচারে জন্মক্ষণ থেকেই উদ্বাস্তু। এ যেনো মানবতার করুণ এক ট্রাজেডি!

আলেয়ার বাড়ি মংডুর ফকিরা বাজারে। স্বামী শাশুড়ি ও দুই সন্তান নিয়ে কাটছিলো তাদের সুখের সংসার। অনাগত সন্তানের আশায় দিনও গুনছিলেন। কিন্তু এর মাঝেই রাখাইনে নৃশংসতা শুরু হলো।


৩০ সেপ্টেম্বর মিয়ানমার সৈন্যরা আলেয়ার ঘরে আগুন ধরিয়ে দিলো। স্বামী আবদুল করিম আত্মরক্ষায় পায়ে পড়ে সেনা অফিসারের। কিন্তু শুনেনি আকুতি। ওই অবস্থাতেই তাকে গুলি করে আরেক সেনা। চোখের সামনে স্বামীর মৃত্যু।


শুরু হয় স্বামী হারা আলেয়ার উদ্বাস্তু জীবন। মা ও ভাইদের সাথে দুই সন্তান ও শাশুড়িকে নিয়ে অনিশ্চিত জীবনের দিকে পা বাড়ান। কোরবানির ঈদের দিনেই রওয়ানা হয় বাংলাদেশের দিকে। পেটে সন্তান নিয়েই মাইলের পর মাইল হেঁটে এগুতে থাকে টেকনাফের দিকে। দুর্গম এই পথ যেনো শেষই হচ্ছিলো না। তারপর আসেন নাফ নদীতের তীরে। নৌকায় কিছুদূর এগুতেই স্রোতের তোড়ে ছোট ছেলে শহিদুল পানিতে ভেসে যায়। চোখের সামনে জীবনের জন্য হারিয়ে যায় আলেয়ার কলিজার ধন। সেই কষ্ট বুকে নিয়ে গত শনিবার টেকনাফে পৌঁছে। সেখানে বাঁধা পেয়ে নৌকায় করে মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন গ্রাম শাপলাপুরে গিয়ে পৌঁছে। গত দুইদিন সেখানেই অবস্থান করছিল সর্বহারা আলেয়া।


স্বামী ও সন্তান হারোনো উদ্বাস্তু আলেয়া শহিদুলের স্মৃতি কিছুতেই ভুলতেই পারছে না। এখন নতুন সন্তান এসেছে। বৃষ্টি হলে অন্যদের সাথে সেও ভিজবে। তার উপর পেটে খাবার নেই। বুকে দুধ নেই। নবজাতককে কিভাবে বাঁচাবে, তা তিনি ভাবতেই পারছে না।


অনুপ্রবেশকারী তিন লক্ষাধিক রোহিঙ্গার মধ্যে টেকনাফ উখিয়ার রোহিঙ্গা শিবির, রাস্তার ধারে কিংবা ঝোপঝাড়ে এরকম অসংখ্য আলেয়ার দেখা মিলবে। যারা সবাই মিয়ানমার থেকে এসে বাংলাদেশে সন্তান জন্ম দিয়েছেন। আর জন্ম নেয়া এসব নবজাতকদের ভাগ্যে জন্মক্ষণ থেকে উদ্বাস্তু জীবন ঝুটেছে। কে জানে, জন্মের পর নিজের কোনো দেশ থাকবেনা জানলে তারা জন্মাতো কিনা!


অনেকে মা আবার এক মাস, এক সপ্তাহ বয়সী সন্তান নিয়েও মাইলের পর মাইল পাহাড়, জঙ্গল পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করছেন। তাদের এমন অবিশ্বাস্য যাত্রার গল্পগুলো তাদের নিজেদেরও বিশ্বাস হচ্ছেনা ! আবার আগে থেকে টেকনাফ উখিয়ায় অবস্থান করা রোহিঙ্গা নারীরা যেসব সন্তানের জন্ম দিচ্ছেন তাদের ভাগ্যেও জুটছে শরনার্থী জীবন।

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন