শিরোনাম :

ব্রিটিশ মিডিয়া, বিএনপি এবং আমরা


রবিবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৭, ০৯:৩০ পূর্বাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

ব্রিটিশ মিডিয়া, বিএনপি এবং আমরা

নাদীম কাদির: ব্রিটিশ মিডিয়ার এক ধরনের বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। এর কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্বের জনমত তৈরিতে ব্রিটিশ মিডিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দ্বিপক্ষীয় দাতা দেশ যুক্তরাজ্য এবং দেশটিতে অনেক বাংলাদেশি অভিবাসী বসবাস করেন।
দেশটির রাজনীতি, বাণিজ্য ও প্রশাসনিক কাজে বাংলাদেশি অভিবাসীদের অংশগ্রহণ ও প্রভাব ক্রমবর্ধমান। যদিও মূলধারার ইংরেজি মিডিয়া তা খুব সামান্য।
লন্ডনে বাংলাদেশ সরকারের মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্বে থাকার সময় ২০১৫ সালের মে থেকে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আমার জন্য বেশ কিছু বিস্ময় অপেক্ষা করছিল।
এর মধ্যে প্রথমটি হলো আমাদের ২০১৪ সালের নির্বাচন এবং কেন নির্বাচন থেকে বিএনপিকে ‘বাইরে রাখা হয়েছিল’। আমি অবাক হইনি কিন্তু বুঝতে পারছিলাম বিরোধী দল ও তাদের স্বাধীনতাবিরোধী মিত্র জামায়ত যে ব্যাপক প্রচারণা চালিয়েছে। এই প্রচারণার জবাব বা ব্যাখ্যা সংশ্লিষ্ট যাদের দেওয়ার কথা তারা তা করেননি।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ৪৬ বছরের মধ্যে আমি প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে লন্ডন প্রেস ক্লাবের প্রথম সদস্য হই। সদস্য হওয়ার পর আমি বিস্মিত হলাম কারণ অনেক সদস্যই জানেন না যে, লন্ডনে বাংলাদেশি একটি হাইকমিশন রয়েছে। আর হাইকমিশনের মুখপাত্রের দায়িত্বে থাকা প্রেস মিনিস্টারের কথা বাদই দিলাম।

ফি অনেক বেশি থাকায় প্রেসক্লাবের সদস্য হওয়ার ক্ষেত্রে আমাকে প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়েছে। ওই সময়কার মিশন প্রধান ও তার বিশ্বস্ত সহকারী ভেবে পাচ্ছিলেন না, এই কাজে কেন আমি অর্থ খরচ করতে চাচ্ছি বা তথ্য মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দের অপব্যবহার করছি।  বাধা পেরিয়ে কাজটি করে ছেড়েছি যদিও খারাপ ছেলে হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছিলাম (আমলারা আমাকে এই নামে আখ্যায়িত করেছেন বলে আমি জানতে পেরেছি)!

যাইহোক, আমি ব্রিটিশ মিডিয়াকর্মীদের কাছে ব্যাখ্যা করি যে, নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের যোগ দেওয়ার জন্য খালেদা জিয়াকে আহ্বান জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাদেরকে সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্বরাষ্ট্র ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন তিনি।

আমি তাদের আরও বলেছিলাম যে, বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য রাজি করাতে টেলিফোন করার সময় আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে কিভাবে অপমান করা হয়েছিল। এরপর আসে সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে নিরাপরাধ মানুষকে জিম্মি করে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো। নিহতদের মধ্যে অনেক শিশুও ছিল এবং অনেকেই আজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে যান। ঘটনার ছবি দেখানোর পর অবশেষে ব্রিটিশ মিডিয়াকর্মীরা বিষয়টি মেনে নেয়।

এরপরও প্রশ্ন ওঠে, বিএনপিকে ‘বাইরে রেখে’ যে নির্বাচন তা কোন ধরনের গণতন্ত্র। আমি পাল্টা প্রশ্ন করি, কী ‘বাইরে রাখা’ হয়েছে, কারা বলছে? আমি তাদের জিজ্ঞেস করি, আপনারা শেখ হাসিনার জায়গায় হলে কী করতেন? কোনও সুনির্দিষ্ট জবাব পাইনি। আমি তাদের বুঝাতে সক্ষম হই যে, গণতন্ত্রে নির্বাচনে অংশ গ্রহণের জন্য কাউকে আপনারা বাধ্য করতে পারেন না এবং আমাদের একটি কার্যকর সংসদও রয়েছে।

সেক্ষেত্রেও আমি বিজয়ী হয়েছিলাম!

পরে আমি আবার আশ্চর্য হলাম, যখন পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে আবারও একই ধরনের প্রশ্ন করা হয়। প্রধানমন্ত্রীকে বলা হয়, নির্বাচনে বিএনপিকে নিয়ে আসার জন্য কী করা উচিত।

মিডিয়া কর্মীদের শেষ প্রশ্নটি সব সীমা লঙ্ঘন করেছে। কম্বোডিয়া থেকে ফিরে প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলন শেষ ঘোষণা হওয়ার পরও একজন সাংবাদিক ভয়াবহ প্রশ্ন করে বসেন।  তিনি প্রশ্ন করেন, নির্বাচন এবং বিএনপিকে নিয়ে আপনি পাশ কাটিয়ে যাচ্ছেন।  বলা প্রয়োজন, সংবাদ সম্মেলন শেষ ঘোষণার পরও সাংবাদিকদের মাইক্রোফোন দেওয়া উচিত ছিল না।

আমরা যদি তাকে এসব প্রশ্ন করি, বিশেষ করে লন্ডনে যাওয়ার জন্য ষড়যন্ত্র ও লবিং নিয়ে যারা ব্যস্ত- তাহলে আমরা কিভাবে আমাদের দেশ ও প্রধানমন্ত্রীকে রক্ষার প্রত্যাশা করতে পারি?

এসব প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরক্ত হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কারণ বিরোধী বিএনপির সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য তাকে অনেক পথ পাড়ি দিয়ে আসতে হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে সেই ১৯৯১ সালের অবস্থানই দেখানো হয়েছে।

বিএনপি চায় বলেই সংবিধান সংশোধন করা যায় না। এই ব্যাপারটাকে কেন গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না যে, সংবিধান পরিবর্তনের বিষয়ে উভয় দলের ইচ্ছে যদি সমান না হয়,  বিএনপি’র ইচ্ছে যদি গুরুত্বপূর্ণ হয়; তাহলে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের অবস্থান অবশ্যই আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ।

দেশের জাতীয় মিডিয়াগুলোকে এ কথা মাথায় রাখতে হবে যে, এ ধরনের প্রশ্নের ফলে বিদেশে বিরোধীদের দাবিকে গ্রহণযোগ্য করে তোলা হয় এবং বিভিন্ন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কঠোর পরিশ্রমকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ ও তাদের পরিবারের প্রতি ন্যূনতম শ্রদ্ধা না থাকা রাজাকার, আল-বদর, আল-শামসদের নিয়ে বিএনপির ক্ষমতা দখলের কৌশলের কাছে নত না হয়ে বিদেশি বন্ধুদের কাছে কর্তৃত্বের সঙ্গে স্পষ্ট বাস্তবতা আমাদের তুলে ধরতে হবে।

যারা এ ধরনের প্রশ্ন করেন তাদের দ্বিতীয়বার বিষয়টি নিয়ে ভাবা উচিত। তাদের ভাবা উচিত, তারা কি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহচর সন্ত্রাসীদের অধীনে একটি ছদ্মবেশী পাকিস্তানের মতো দেশে বাসবাস করতে প্রস্তুত আছে।

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন