শিরোনাম :

কাপ্তাইয়ে রুই কমেছে


রবিবার, ২২ জুলাই ২০১৮, ১০:৪৬ পূর্বাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

কাপ্তাইয়ে রুই কমেছে

রাঙামাটি: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সর্ববৃহৎ হ্রদ কাপ্তাইয়ে রুই জাতীয় মাছের উৎপাদন কমে গেছে আশঙ্কাজনক হারে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, রাঙামাটির গবেষণা অনুযায়ী, ৮১ থেকে ৫ শতাংশে নেমে এসেছে রুই জাতীয় মাছের উৎপাদন। তবে এর বিপরীতে হ্রদে ছোট মাছের হার বেড়েছে বহুগুণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হ্রদে পলি জমাট ও চেঙ্গী নদীর চ্যানেলে রাবার ড্যাম নির্মাণের কারণে রুই জাতীয় মাছের প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র নষ্ট হওয়ায় এর উৎপাদন কমে গেছে।


১৯৬১ সালে খরস্রোতা কর্ণফুলীর ওপর বাঁধ দিয়ে গড়ে তোলা হয় কাপ্তাইয়ের কর্ণফুলী জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র। ফলে ৭০০ বর্গমাইল এলাকাজুড়ে সৃষ্টি হয় এক বিশাল কৃত্রিম হ্রদ। বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশন হ্রদটি লিজ নিয়ে ১৯৬৪ সাল থেকে এখান থেকে বাণিজ্যেক ভিত্তিতে মৎস্য আহরণ শুরু করে। এ হ্রদে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন প্রায় ২১ হাজারের বেশি জেলে।


মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, রাঙামাটির গবেষণাপত্র থেকে জানা যায়, কাপ্তাই হ্রদ এক সময় ৭৫ প্রজাতির মিঠা পানির মাছের বিচরণক্ষেত্র ছিল। এর মধ্যে ৬৭ প্রজাতি দেশীয় এবং ৮ প্রজাতি বিদেশি। এরই মধ্যে দেশি সরপুঁটি, ঘাউরা, বাঘাড়, মোহিনী বাটা ও দেশি পাঙাশ হ্রদ থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বিলুপ্তির পথে রয়েছে দেশি মহাশোল, মধু পাবদা, পোয়া, ফাইস্যা, তেলে গুলশা ও সাদা গুনিয়া।


এ ছাড়া ক্রমহ্রাসমান মাছের মধ্যে রয়েছে রুই, কাতলা, মৃগেল, বাঁচা, পাতি পাবদা ও বড় চিতল। এগুলোর উৎপাদন ৮১ থেকে ৫ শতাংশে চলে এসেছে। তবে এর বিপরীতে হ্রদে ছোট মাছের মধ্যে কাঁচকি, চাপিলা, কাঁটা মইল্যা, তেলাপিয়া, কালবাউশ, আইড়, বাটা, ফলি ও মলা মাছের সংখ্যা বেড়ে ৮ থেকে ৯২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।


মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, রাঙামাটির অন্য এক তথ্যে জানা গেছে, ১৯৯৭-৯৮ সালে কাপ্তাই হ্রদ থেকে প্রায় ৪৮ টন রুই জাতীয় মাছ আহরণ করা হয়। কিন্তু ২০০০-০১ সালে রুই মাছ আহরণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩১১ টন। আবার ১৯৯৭-৯৮ সালে হ্রদে রুই জাতীয় মাছের পোনা মজুদের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৬ দশমিক ৫৫ টন। ২০০০-০১ সালে তা নেমে আসে পাঁচ দশমিক ৫৫ টন।


এদিকে, কাপ্তাই হ্রদে মাছের প্রজনন বৃদ্ধি ও হ্রদে ভারসাম্য রক্ষায় প্রতি বর্ষা মৌসুমে তিন মাস মাছ আহরণ ও বিপণন বন্ধের ওপর নিষেধাজ্ঞা ও বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশন, রাঙামাটির কঠোর নজরদারির কারণে এ হ্রদে মোট মাছের উৎপাদন বাড়ছে। গত বছর এই হ্রদ থেকে ৮ হাজার ৪২১ টন মাছ উৎপাদিত হয়েছে। এতে রাজস্ব আয় হয়েছে প্রায় ১৩ কোটি ২৩ লাখ টাকা।


সেইসঙ্গে আশ্চর্যজনকভাবে হ্রদে বিস্তার ঘটেছে বিদেশি প্রজাতির গ্রাস কার্প, রাজপুঁটি, নাইলোটিকা, সিলভার কার্প, তেলাপিয়া, মোজাম্বিকা তেলাপিয়া, থাই মহাশোল, পিরানহা এবং আফ্রিকান মাগুরের। এগুলোর মধ্যে বেশ কিছু মাছ বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনের নিজস্ব আমদানি হলেও কাপ্তাই হ্রদে তেলাপিয়া, পিরানহা, আফ্রিকান মাগুর কোথা থেকে এসেছে তা কেউ বলতে পারছে না।


বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, রাঙামাটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কাজী বেলাল উদ্দীন বলেন, হ্রদে রুই জাতীয় মাছের প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্রের মধ্যে কাচালং চ্যানেলের মাইনিমুখ, বরকল চ্যানেলের জগন্নাথছড়ি, চেঙ্গী চ্যানেলের নানিয়ারচর এবং রাইখ্যং চ্যানেলের বিলাইছড়ি এলাকা রয়েছে। ইতিমধ্যে দুটি চ্যানেলের মাছের প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র নষ্ট হয়ে গেছে। এর মধ্যে চেঙ্গী চ্যানেলে খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি উপজেলায় রাবার ড্যাম নির্মাণের কারণে পানির প্রবাহ আশঙ্কাজনক হারে হ্রাসে পেয়েছে এবং ওই চ্যানেলের বিভিন্ন জায়গায় পানি শুকিয়ে চর জেগে উঠেছে। রাইখ্যং চ্যানেলে পলি জমে চ্যানেলের গভীরতা কমে গেছে এবং কিছু কিছু জায়গায় প্রাক-প্রজনন মৌসুমে পানির গভীরতা ২ থেকে ৩ ফুট পর্যন্ত হয়ে যায়। ফলে প্রাক-প্রজনন মৌসুমে কার্প জাতীয় মাছ অভিপ্রায়ণ করতে পারে না।


তিনি আরও বলেন, পাহাড়ি ঘোনায় কার্প জাতীয় মাছের রেণু উৎপাদনের কৌশল উদ্ভাবন করে পাহাড়ি এলাকায় গুণগত মানসম্পন্ন পোনার সরবরাহ ও প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা এবং গবেষণা কার্যক্রমের মাধ্যমে কাপ্তাই হ্রদে কার্প জাতীয় মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন পুনঃনিশ্চিত করা জরুরি।

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন