শিরোনাম :

অনুমোদন ছাড়াই কক্সবাজারে মার্কেট নির্মাণের মহোৎসব চলছে


বৃহস্পতিবার, ১ নভেম্বর ২০১৮, ১০:৩৪ পূর্বাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

অনুমোদন ছাড়াই কক্সবাজারে মার্কেট নির্মাণের মহোৎসব চলছে


কক্সবাজার: কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান লে. কর্নেল (অব.) ফোরকান আহমদ জানিয়েছিলেন, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত তীরের ৩০০ মিটারের মধ্যে আর কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না। ২০১৭ সালের ২৩ জানুয়ারি ‘ইমারত নির্মাণ ও ভূমি উন্নয়ন অনুমোদন কার্যক্রম উদ্বোধন’ উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেছিলেন।

কউক চেয়ারম্যান জানান, যে কোনো জমিতে অবকাঠামো নির্মাণ পূর্বে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র গ্রহণ করতে হবে। অনুমোদন ছাড়া অবকাঠামো নির্মাণ করলে তা ভাঙতে বেশি সময় লাগবে না।

কিন্তু বেশ কিছুদিন ধরে কউকের অনুমোদন ছাড়াই কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টে বালিয়াড়ি দখল করে স্থায়ীভাবে মার্কেট নির্মাণের মহোৎসব চলছে। দীর্ঘদিন ধরে এই পয়েন্টের বালিয়াড়িতে প্রায় দুই শতাধিক ঝুঁপড়ি দোকান থাকলেও; বর্তমানে এসব ঝুঁপড়ির পাশাপাশি সেখানে স্থায়ী মার্কেট নির্মাণের কাজ চলছে।

সমুদ্র সৈকতের ১০০ মিটারের মধ্যে বালিয়াড়ি দখল করে স্থায়ীভাবে তিন শতাধিক মার্কেট নির্মাণের কাজ চলায় ফুঁসে উঠেছে কক্সবাজারের মানুষ। এনিয়ে গত কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন নাগরিক ও সামাজিক আন্দোলনের কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।

কক্সবাজার সম্পদ রক্ষা আন্দোলনের নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়েছে, পর্যটকদের জন্য হাটাচলার উন্মুক্ত বালিয়াড়ির উপর একটি বেসকারি বিজ্ঞাপনী সংস্থার মাধ্যমে জেলা প্রশাসনের বীচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির নির্মাণাধীন মার্কেট বন্ধ করতে দ্রুত মাঠে নামবে।

তারা জানান- সৈকতের বালিয়াড়িতে কোনো ধরণের স্থাপনা নির্মাণ না করার নির্দেশনা রয়েছে। তাছাড়া পর্যটকদের জন্য সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্ট হলো একটি আকর্ষণীয় স্থান। অধিকাংশ পর্যটক সুগন্ধা পয়েন্টের বালিয়াড়ি দিয়ে সৈকতে নামেন। কিন্তু একটি চক্র সেই বালিয়াড়ির উপর স্থায়ী মার্কেট নির্মাণ করেই যাচ্ছে। যেখানে সৈকতের বালিয়াড়ি পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে, সেখানে আইন না মেনেই মার্কেট নির্মাণ করা হচ্ছে।
কক্সবাজার সম্পদ রক্ষা আন্দোলনের নেতা নাজিম উদ্দিন বলেন, পুরো বিশ্বের কাছে পরিচিত কক্সবাজারের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত।

প্রতি বছর লাখ লাখ পর্যটক টাকা খরচ করে সমুদ্রসৈকত দেখতে আসেন। সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্ট ঘুরে তারা আনন্দ উপভোগ করেন। কিন্তু যেখানে পর্যটকদের আনন্দ করার এবং মুক্ত আকাশের নিচে ঘুরে বেড়ানোর জায়গা; সেই বালিয়াড়ির উপর কিভাবে স্থায়ী মার্কেট নির্মাণ করা সম্ভব ? পুরো সুগন্ধা পয়েন্টে সৈকতের বাড়িয়াড়ি দখল করে শত শত মার্কেট নির্মাণের কর্মযজ্ঞ চলছে। এই মার্কেটের কারণে পর্যটকরা হাটতে পারবেনা। সৈকতে নামার যে বিনোদন ছিল সেটা হারিয়ে যাবে। কিভাবে জেলা প্রশাসন বাড়িয়াড়ির উপর স্থায়ী মার্কেট নির্মাণ করে যাচ্ছে; তা ভাবতে অবাক লাগছে। এটি কক্সবাজারের সম্পদ। এই সম্পদ রক্ষা করতে আমাদের যা করা দরকার পড়ে দ্রুত সময়ে আমরা তা করবো।

কক্সবাজার পিপল্স ফোরামের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ ইকবাল বলেন, সৈকতের বালিয়াড়িতে মার্কেট নির্মাণের কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছি না। জানি পর্যটকদের সুবিধার জন্য মার্কেটের প্রয়োজন আছে। তাই বলে কি; সমুদ্রসৈকতের বালিয়াড়িতে নির্মাণ করতে হবে ? বালিয়াড়ি ছাড়া সৈকতের পাশে আরো অনেক জায়গা আছে। এসব জায়গায় নির্মাণ করলে একটি সুন্দর পরিবেশ হতো। এখন বালিয়াড়ি দখল করে মার্কেট নির্মাণের কারণে সৈকতকে ঢেকে ফেলা হচ্ছে। সৈকতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। একটি নোংরা ও ঘিঞ্জি সৈকতে পরিণত হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, বীচ ম্যানেজম্যান্ট কমিটির কাজ কি শুধুমাত্র সৈকতের বালিয়াড়ি বিক্রি করা। এই কমিটি বীচটাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এতদিন যা হওয়ার হয়েছে, কিন্তু এখন নির্বাচনের আগে সৈকতে দখলের এই নৈরাজ্য বন্ধ না করলে একটি বড় ধরণের প্রভাব পড়বে। কারণ একের পর এক সৈকতের বালিয়াড়ি দখল করে স্থাপনা নির্মাণের কারণে মানুষের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।

জাতীয় তেল গ্যাস রক্ষা কমিটির কক্সবাজার জেলার সদস্য সচিব ও কক্সবাজার সম্পদ রক্ষা আন্দোলনের মুখপাত্র কলিম উল্লাহ বলেন, হাইকোর্ট রিটপিটিশন মামলা অনুযায়ী (মামলা নং-৬২৬/১১) ৭/৬/১১ তারিখের আদেশে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত এলাকা রক্ষা এবং সংরক্ষণ করার বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু এই নির্দেশনা না মেনেই স্থায়ীভাবে সুগন্ধা পয়েন্টে মার্কেট নির্মাণ করা হচ্ছে। যারা এই নিদের্শনা বাস্তবায়ন করবেন, যারা এই সম্পদ রক্ষা করবেন; আজ তারাই বাড়িয়াড়ি দখল করে মার্কেট নির্মাণ করে যাচ্ছে। এটি কক্সবাজারে সম্পদ। এই সম্পদ রক্ষা করা সকলের অধিকার রয়েছে। কোনোভাবেই এই অন্যায় মেনে নেওয়া হবে না। প্রয়োজন কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।

তিনি বলেন, ‘গত ২৭ অক্টোবর কক্সবাজার হিল ডাউন সার্কিট হাউজে ‘সেন্টমার্টিন দ্বীপের বিরল জীববৈচিত্র্য এবং প্রতিবেশ সংরক্ষণে মতবিনিময় সভা’ হয়েছিল। সেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহামুদ। এতে পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে বক্তব্য দিয়েছেন কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান লে. কর্নেল (অব.) ফোরকান আহমদ।

চেয়ারম্যানের বক্তব্যের প্রসঙ্গে প্রশ্ন উঠেছিল; কক্সবাজার সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টের বালিয়াড়িতে নতুন করে স্থায়ীভাবে মার্কেট নির্মাণের কাজ চলছে। বালিয়াড়িতে কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে কিনা, আর এই স্থাপনার বিষয়ে অনুমোদন দেয়া হয়েছে কিনা। জবাবে ফোরকান আহমদ বলেছিলেন, মার্কেট নির্মাণের বিষয়টি আমি শুনেছি। তবে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো অনুমোদন নেওয়া হয়নি। ওখানে অনেক বিষয় রয়েছে। তাছাড়া জেলা প্রশাসনের বীচ ম্যানেজমেন্ট বলে একটি কমিটিও আছে।

কলিম উল্লাহ বলেন, প্রশাসন করলে বৈধ হবে। আর সাধারণ জনগণ করলে বৈধ হবে না। এটা কোন ধরণের আইন। ইতোমধ্যে সৈকতের পাশে নিজস্ব জায়গায় অনেকেই স্থাপনা নির্মাণ করতেও ব্যর্থ হয়েছে প্রশাসনের বাঁধার কারণে। অনেক স্থাপনা উচ্ছেদও করা হয়েছে। যেসব স্থাপনায় প্রশাসন বাঁধা দিয়েছে সেগুলো বালিয়াড়িতে ছিল না। রাস্তার পাশেই ছিল। কিন্তু এখন প্রশাসন নিজেই বাড়িয়াড়ি দখল করে শত শত মার্কেট নির্মাণ করে যাচ্ছে। এটা কোন ধরণের আইনে বুঝতে পারছি না?

কক্সবাজার সোসাইটির সভাপতি কমরেড গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘নির্মাণাধীন মার্কেটের বিষয়ে জেলা প্রশাসকের সাথে কথা হয়েছে। তিনি (ডিসি) বলেছেন আগে ঝুঁপড়ির মধ্যে মার্কেট ছিল। দেখতে তেমন সুন্দর লাগত না। পর্যটন এলাকায় সৌর্ন্দয্য বাড়ানোর জন্য সারিবদ্ধভাবে মার্কেট তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উদ্যোগটি বিদায়ী জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন দায়িত্ব থাকাকালিন নেওয়া হয়েছিল। এটি এখন বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।’

গিয়াস উদ্দিন বলেন, বালিয়াড়ির উপর মার্কেট নির্মাণ কতুটুকু পরিবেশ সম্মত বা ভবিষ্যতে কোনো দুর্যোগ মোকাবেলা করতে হবে কিনা আমার ধারণা নেই। এবিষয়ে প্রশাসন ভালো জানবে। তবে ভালো কিছু হোক আমরা সবাই চায়।

কক্সবাজার সম্পদ রক্ষা আন্দোলনের আহ্বায়ক মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী বলেন- আমি যতটুকু জানি সুগন্ধা পয়েন্টে আগে ঝুঁপড়ির মধ্যে দোকান করত আমাদের এলাকার দরিদ্র লোকজন। এখন প্রশাসন উদ্দ্যোগ নিয়েছে ঝুঁপড়ি গুলো সরিয়ে পরিবেশ সম্মত সারিবদ্ধভাবে মার্কেট নির্মাণ করার জন্য। তবে সৈকতের কতটুকু বালিয়াড়ির উপরে নির্মাণ করা হচ্ছে তা আমি এখনো দেখিনি।

কক্সবাজার জেলা আওয়ামীলীগের প্রভাবশালী নেতা এড. ফরিদুল আলম বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশনা রয়েছে সৈকতের বালিয়াড়িতে কোনো ধরণের স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না। যদি কেউ নির্দেশনা না মেনে স্থাপনা নির্মাণ করে তাহলে জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা করা যাবে। এটি আইনে বলা আছে।

তিনি আরও বলেন, অনেকে ক্ষমতা অপব্যবহার করে অবৈধভাবে মার্কেট নির্মাণে জড়িত রয়েছে। দল ক্ষমতায় বলে যা ইচ্ছা তা করা যায় না। গায়ের জোর সবখানে হয় না। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মার্কেট নির্মাণ করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি চক্র। অনেক হয়েছে, এখন আর না। সমুদ্র সৈকতকে আমাদের প্রজন্মের স্বার্থে হলেও রক্ষা করা দরকার। তাই সবার উচিত এই অশুভ চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা।

কক্সবাজার বীচ ম্যানেজম্যান্ট কমিটির সদস্য ও জেলা জাসদের সভাপতি নইমুল হক চৌধুরী টুটুল বলেন, বালিয়াড়ি দখলের অভিযোগটি সত্য নয়। একটি চক্র বিভ্রান্ত ছড়াচ্ছে। মূলত বিভিন্নভাবে তৈরী ঝুঁপড়ি গুলো দেখতে সুন্দর লাগতো না। তাই বীচ ম্যানেজম্যান্ট কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় সুন্দরভাবে পরিবেশ সম্মত মার্কেট করে ঝুঁপড়ি গুলোকে সেখানে পুর্নবাসন করার। সেই সিদ্ধান্তের আলোকে মার্কেটটি নির্মাণ করা হচ্ছে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (উন্নয়ন ও মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা) এস এম সরওয়ার কামাল বলেন, এটা স্থায়ীভাবে নির্মাণ করা হচ্ছে না। যেকোন মুহুর্তে এটা তুলে ফেলা যাবে। স্থায়ীভাবে করার কোন সুযোগ নেই।

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন