শিরোনাম :

১০ বছরেও থামেনি উপকূলের মানুষের কান্না


বুধবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৭, ১২:২১ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

১০ বছরেও থামেনি উপকূলের মানুষের কান্না

ডেস্ক প্রতিবেদন: আজ ১৫ নভেম্বর।সুপার সাইক্লোন সিডরের দশম বর্ষপূর্তি। সময়ের গর্ভে ১০টি বছর চলে গেলেও আজও কান্না থামেনি পটুয়াখালী উপকূলের প্রায় ১৫ লাখ মানুষের।সিডরের কথা স্মরণ করে আজও আঁতকে উঠেন সিডর বিধ্বস্ত এলাকার সাধারণ মানুষেরা।

সরেজমিন পরিদর্শনকালে স্থানীয়রা জানান, সিডরের ১০ বছর পরেও পটুয়াখালীর বিধ্বস্ত বেড়িবাঁধগুলো সম্পূর্ণ মেরামত হয়নি।যা হয়েছে তাও সঠিক মাপে না হওয়ায় শঙ্কিত তারা।ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা ছিল উঁচু বেড়িবাঁধ নির্মাণের।কিন্তু গত ১০ বছরে তার সিকিভাগও বাস্তবায়ন হয়নি।

জেলা প্রশাসন,পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় সুত্র জানায়, ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর রাতের ঘূর্ণিঝড় সিডর কেড়ে নেয় পটুয়াখালী জেলার ৬৭৭ জন মানুষের প্রাণ। লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় প্রায় ৫৫ হাজার ঘরবাড়ি। জেলার মোট ১২৫০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে সিডরে বিধ্বস্ত হয় প্রায় ৯০০ কিলোামিটার।
সিডরে জেলায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় জেলার মির্জাগঞ্জ উপজেলার চরখালী-গোলখালী ও রানীপুর এলাকা। কেবলমাত্র চরখালী গ্রামেই সিডরে মারা যায় ৮০ জন মানুষ। শুধু মানুষই নয় হাজার হাজার গৃহপালিত পশু-পাখিও মারা যায় সে সময়।

চরখালী গ্রামের বৃদ্ধ আতাহার আলী(৭৫) জানান, সিডরে তার পরিবারের পাঁচজন সদস্য নিহত হয়েছে। তাদের দাবি ছিল পায়রা নদীর পাড় ঘেষে উঁচু বেরিবাঁধ নির্মাণের। কিন্তু গত ১০ বছরে সেই বাঁধ আজও নির্মাণ হয়নি।
একই এলাকার সত্তার(৪৫), হামিদা(৩৪) জানান, এখনও আকাশে মেঘ দেখলে তাদের রাতে আর ঘুম হয় না। ছোট ছোট শিশুরা এখনও রাতের আধারে কেঁদে উঠে। আজ ১০ বছর পার হলেও কান্না থামেনি উপকুলের সাধারণ মানুষের।

মির্জাগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান খান মো. আবু বক্কর সিদ্দিক জানান, সিডরের সময় মির্জাগঞ্জ এলাকার কয়েকশ’ লোক নিহত হয়েছেন। এলাকার বেশির ভাগ বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। আজ পর্যন্ত বেরিবাঁধগুলো মেরামত করা হয়নি। ফলে জীবনের আশঙ্কায় রয়েছে লক্ষাধিক মানুষের।
পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ হাসানুজ্জামান জানান, ক্ষতিগ্রস্ত বেরিবাঁধগুলো গুরুত্ব বিবেচনায় মেরামত করা হচ্ছে। এখনও অনেক বেরিবাঁধ মেরামত বাকি রয়েছে। বরাদ্দ সাপেক্ষে এ বাঁধগুলো মেরামত করা হবে।

উল্লেখ্য, ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর রাতে শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়াল সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড় উপকূলীয় অঞ্চল লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছিল। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপে সকাল থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। নিম্নচাপটি কয়েক বার গতি পরিবর্তন করে মধ্যরাতে অগ্নিমূর্তি ধারণ করে।
রাতে ঘূর্ণিঝড়টি আঘাত হানে ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা উপকূলীয় অঞ্চলে। আগের দিনও যে জণপদ ছিল মানুষের কোলাহলে মুখরিত, মাঠ জুড়ে ছিল কাঁচা-পাকা সোনালি ধানের সমারোহ, পরের দিনই সেই চির চেনা জনপথ পালটে যায়।

উপকূলীয় অঞ্চলের শত-শত মানুষের জীবন প্রদীপ নিভে যায়। এখনো নিখোঁজ রয়েছে বহু মানুষ। মারা গিয়ে ছিল হাজার হাজার গবাদি পশু। ঝড়ের তীব্রতা কমে যাওয়ার পর শুরু হয় স্বজনদের খোঁজাখুঁজি। গাছের ডালে কিংবা বাড়ি ঘরের খুঁটির সঙ্গে ঝুুলে আছে স্বজনদের লাশ।যে দিকে চোখ যায় শুধু লাশ আর লাশ উপকূলের বাতাসের কানপাতলেই মৃত্যু পথযাত্রি শত মানুষের চিৎকার আর স্বজনদের আহাজারি ১০ বছর পেরিয়ে গেলেও সেদিনের দুঃসহ স্মৃতি আজও জেগে আছে স্বজনহারাদের মাঝে। দুঃখ স্বপ্নের মতো আজও তাড়া করে তাদের।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বরিশাল অঞ্চলের কার্যালয় জানিয়েছে, দেশের উপকূল সুরক্ষায় বর্তমানে ১২৩টি পোল্ডারের অধীনে পাউবোর পাঁচ হাজার ১০৭ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ রয়েছে। এর মধ্যে ৯৫৭ কিলোমিটার হচ্ছে সমুদ্র-তীরবর্তী বাঁধ। সমুদ্রের তীরবর্তী এই বাঁধের সিংহভাগই বরিশাল, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, ঝালকাঠি ও পিরোজপুর জেলার আওতায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও জানা যায়, ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বরের সিডরে উপকূলীয় অঞ্চলের দুই হাজার ৩৪১ কিলোমিটার বাঁধ আংশিক ও সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৭০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ছয় জেলার প্রায় ১৮০ কিলোমিটার সম্পূর্ণ এবং এক হাজার ৪০০ কিলোমিটার বাঁধ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন