শিরোনাম :

অনুকরণীয় এক দৃষ্টান্তের নাম এসআই শবনম


রবিবার, ২০ মে ২০১৮, ০৪:০১ অপরাহ্ণ, বাংলাপ্রেস ডটকম ডটবিডি

অনুকরণীয় এক দৃষ্টান্তের নাম এসআই শবনম

ঢাকা: আমি শবনম। মানুষ হিসেবে হয়তো দুয়েকটি ভুল করতে পারি। কিন্তু পুলিশ হিসেবে জানা মতে কখনো ভুল বা অন্যায় করিনি। ডিপার্টমেন্টের দেওয়া আদেশ নিষেধ অক্ষরে অক্ষরে পালন করাটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

তেজগাঁও থানার এসআই শবনম সুলতানা পপি মানবিকতায় স্থাপন করলেন এমন এক দৃষ্টান্ত। ইউনিফর্ম গায়ে চাপিয়ে যখন নিজের ডিউটিতে থাকেন, তখন তিনি শুধু কর্তব্যরত একজন পুলিশ নন, মানবিকতাবোধ সম্পন্ন একজন মানুষ। তার মানবিকতায় কাজে সন্তুষ্ট হয়ে ৭ মে সোমবার পুলিশ সদর দফতরে বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী পুরস্কার তুলে দেন।

২২ এপ্রিল শবনম সুলতানা পপির কল সাইন ছিল ‘এপোলো-সিক্স-ওয়ান’। রুটিন ডিউটি ছিল মহাখালী এলাকায়। হঠাৎ ওয়্যারলেসে বার্তা এলো প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের দিকে ঢোকার মুখে মহাখালী ফ্লাইওভারের শেষ মাথা শাহীনবাগ এলাকায় একটি এক্সিডেন্ট হয়েছে। বার্তা শুনে মুহূর্তেই ছুটে যান ঘটনাস্থলে। পৌঁছে দেখেন কয়েকটি গাড়ি একইসঙ্গে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। পেছনে লম্বা যানজট বেঁধে গেছে এরই মধ্যে। ভিআইপি পরিবহনের একটি বাস ফ্লাইওভার থেকে নিচে নামার সময় ব্রেকফেল করে সামনে থাকা গাড়িগুলোতে ধাক্কা মারে। একটা পিক-আপ ভ্যান উল্টে একজন মারাত্মকভাবে আহত হয়। কয়েকজন মোটর বাইক আরোহীও আহত হন সে সময়। ‘ঘটনার গুরুত্ব বুঝে আমি কাছাকাছি থাকা অন্য পুলিশ সদস্যদের সাহায্য নিই। ভিআইপি পরিবহনের বিকল হয়ে পড়ে থাকা গাড়িটাকে নিজেই চালিয়ে রাস্তা থেকে সরাই, যাতে পেছনের যানজটটা ছেড়ে দেয়। তারপর উল্টে থাকা পিক-আপের আহত ড্রাইভারকে ফার্স্ট এইড দেওয়ার কথা চিন্তা করি। তার অবস্থা দেখে আমার বেশ খারাপ লাগছিল। তখন আমি একজনকে টাকা দিয়ে বললাম, আমাকে কিছু বরফের টুকরো এনে দিন। আমি আহত লোকটিকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলাম এই বলে যে আপনার কিছুই হয়নি। আমি পরে তার আঘাতের জায়গাগুলোতে বরফের সেঁক দেই। লোকটি বলছিল তার পা বোধহয় ভেঙে গেছে। তখন আমি গামছা দিয়ে সেখানটা বেঁধে দেই। তখন আমার মনে হচ্ছিল, যদি আমি সেই সময়ে এই প্রাথমিক চিকিৎসটা না দেই, এই পা হয়তো আর ভালোই হবে না।’ শবনমের সাহায্যে আহত লোকটি দাঁড়ায়, কিছুটা হাঁটে। তারপর লোকটির কাছের আত্মীয়দের খোঁজ করে বাড়িতে পাঠানোর ব্যবস্থা করি।’ পরবর্তীতে ওই সময় ক্ষতিগ্রস্ত গাড়িগুলোর ক্ষতিপূরণও তিনি দায়িত্ব নিয়ে আদায় করে দেন।

ঘটনার দিন পুলিশের উপ-পরিদর্শক শবনম সুলতানা পপি নিজের কর্তব্য হিসেবেই কাজগুলো করেন। কিন্তু যারা ঘটনাটি দেখেছেন, তারা ছবি তুলেছেন এবং সেই ছবি অনলাইনে শেয়ার করেছেন। দুর্ঘটনায় আহতদের সহায়তায় কোনো পুলিশের এভাবে এগিয়ে আসাটা তাদের কাছে ছিল বিরল এবং অনুকরণীয় এক দৃষ্টান্ত। এই ঘটনার ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করেছেন অনেকে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় তাকে নিয়ে এমন শোরগোলে পপির অনুভূতি একটু অন্যরকম। নিজের প্রশংসায় যতটা না খুশি, তার চেয়ে খুশি অন্যদের ভালো কাজে অনুপ্রাণিত হতে দেখছেন। আর তাই এটিকে বেশ ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন তিনি। তবে তিনি সেদিন যে কাজ করেছেন, তার কাছে তা খুবই সাধারণ। তার মতে, পুলিশের এই কাজই করার কথা। আমি সব সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, তাদের সেবা করার চেষ্টা করি। পুলিশে চাকরির সুবাদে আমাকে এই কাজ আরও বড় পরিসরে করার সুযোগ হয়েছে। এজন্য আমি আমার ডিপার্টমেন্টের প্রতি অনেক বেশি কৃতজ্ঞ।"

পুলিশের যে নেতিবাচক ভাবমূর্তির কথা সবসময় বলা হয়, তার সঙ্গে শবনম একমত নন। পুলিশ কিন্তু বেশিরভাগ সময় ভালো কাজ করে। সাদা কাপড়ে ময়লা লাগলে যেমন বেশি চোখে পড়ে, পুলিশ ডিপার্টমেন্টের ব্যাপারটাও তাই। অন্যায় কিন্তু খুব কমই হয়। আমরা কিন্তু বেশিরভাগ সময় দেশের মানুষের সেবাতেই নিয়োজিত থাকি। তাছাড়া পুলিশে থেকেও যা দুয়েকজনের নামে বদনাম শোনা যায়, তা তাদের ব্যক্তিগত আচরণ। পারিবারিক সুশিক্ষায় শিক্ষিত একজন মানুষ যে পেশাতেই থাকুন না কেন, তার পক্ষে দুর্নীতি করা সম্ভব নয়। তার এ ধরনের কাজ অন্যদেরও ভালো কাজে অনুপ্রাণিত করবে বলে আশা করেন শবনম সুলতানা পপি।

শবনম সুলতানা পপির জন্ম পাবনা জেলাতে। তিন বোনের মাঝে তিনিই ছোট। বড় বোন এসআই, মেজবোন প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক। ব্যক্তিজীবনে উপ-পরিদর্শক স্বামী ও দুই বাচ্চা নিয়ে দারুণ সুখী সংসার। ছোটবেলা থেকেই মানবপ্রেম তার মাঝে জাগ্রত ছিল। তিনি দাবি করেন, পরিবার থেকে পাওয়া শিক্ষায় আজ আমাকে এ ধরনের কাজে উৎসাহ দেয়। মাধ্যমিক পড়ার সময় বাবাকে হারিয়ে কিছুটা দিশেহারা অবস্থা ছিল আমার পরিবারের। তারপরও মায়ের দিক নির্দেশনায় তিন বোনই উচ্চশিক্ষা অর্জন করে সরকারি চাকরিতে যোগদান করি। ছোট থেকেই পুলিশের চাকরি করে মানুষকে সাহায্য করার ব্যাপারে তেমন কোনো ধারণা ছিল না। তবে চাকরিতে আসার পর আমি খুবই গর্বিত। কারণ পুলিশের চাকরিতে মানুষকে খুব কাছ থেকে সাহায্য করা যায়। মানুষকে সাহায্য করতে পেরে আমি ঐশ্বরিক শান্তি পাই। এটাই আমার ইবাদত মনে করি।

আজ আমার এই কাজটি সবার সামনে এসেছে। তবে যে কাজের জন্য আমি পুরস্কৃত ও মানুষের কাছে ইতিবাচক পরিচিতি পাচ্ছি সেটি এমন কোনো বড় কাজ নয়। আমি প্রতিদিনই এ ধরনের কিছু কাজ করতে চাই এবং করিও। তার সব কাজ মানুষের সামনে হয়তো উঠে আসে না। আমি মনে করি, আমার কাজ দেখে যদি একজন মানুষও নিজের চিন্তাধারায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনে তবে আমি স্বার্থক। যেমন ধরুন, প্রতিদিন বাসা থেকে বের হওয়ার সময় আমার স্কুটির প্রয়োজনীয় তেলের বাইরেও ৫০০ মিলি অতিরিক্ত তেল নিজের সংগ্রহে রাখি। রাস্তায় প্রায় প্রতিদিনই দেখি কেউ না কেউ নিজের মোটরসাইকেলটি ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। এমন দেখলে প্রথমে জিজ্ঞেস করি কি সমস্যা। যদি তেল লাগে আমার সংগ্রহেরটি তাকে দিয়ে দিই। দীর্ঘপথ মোটরসাইকেল ঠেলে নিয়ে যাওয়ার কষ্ট থেকে রেহাই পাওয়া ব্যক্তিটার আত্মিক খুশিই আমার কাছে বড় পাওয়া। কখনো কখনো গাড়ি ধাক্কা দিয়েও ইঞ্জিন সচলে সহায়তা করি।

শুধু তাই না, আমার সীমাবদ্ধতার ভিতর থেকে যতটুকু পারি তার পুরোটা দিয়ে আমি মানুষকে সহায়তার চেষ্টা করি। ১৪ মে প্রধানন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে দিয়ে আসছিলাম দুপুর আড়াইটার দিকে। আগারগাঁওগামী একটি চলন্ত বাস থেকে হঠাৎ এক নারী পড়ে যায়। সবাই ভাবছে মারা গেছে। কেউ তাকে বাঁচাতে এগিয়ে এলো না। আমি এগিয়ে যাওয়ার আগেই এই পুলিশ কর্মকর্তা গিয়ে একাই তুলে আনলেন তারপর মাথায় পানি ঢেলে প্রাথমিক চিকিৎসা দিলেন। আমিও সঙ্গে সহযোগিতা করলাম। তারপর সে সিএনজি ঠিক করে দিলেন। আমি তার সঙ্গে গিয়ে মহাখালী হাসপাতালে ভর্তি করে দিলাম। আহত নারী প্রথমেই খুব হকচকিয়ে যায়। কিন্তু আমি বারবার তাকে আশ্বস্ত করি, সাহস দেই। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে নিজেকে শঙ্কামুক্ত শুনে আমাকে জড়িয়ে ধরে তিনি খুব কাঁদেন। আমি বুঝি এটি তার খুশির কান্না। এগুলোই আমাকে ভালো কাজে উৎসাহ দেয়। আমি আমার শান্তি খুঁজে পাই ছোট ছোট এমন সফলতায়।

এ বিভাগের আরো সংবাদ

মন্তব্য করুন